
বীরগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে ১৩৬ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঐতিহ্যবাহী ডাক্তারখানা মাঠের ১ একর ৪৪ শতক সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। গতকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) জেলা পরিষদের সুজালপুর মৌজায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। একই সঙ্গে পৌর শহরের তাজমহল মোড় থেকে থানা গেট পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা ও ফুটপাতের দোকান অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা মাঠটির জমি উদ্ধারের পাশাপাশি সেখানে আধুনিক পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সামনে এসেছে ঐতিহাসিক স্থানটির সংরক্ষণ, সরকারি সম্পত্তির সুরক্ষা এবং পৌরবাসীর জন্য একটি পরিকল্পিত জনপরিসর গড়ে তোলার বিষয়টি।
জেলা পরিষদের নির্দেশনা বাস্তবায়নে পরিচালিত অভিযানে নেতৃত্ব দেন দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনজুর মোর্শেদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুমা খাতুন। অভিযানে বীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলামসহ পুলিশ সদস্যরা অংশ নেন। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা ভূমি অফিস, আনসার ব্যাটালিয়ন, ফায়ার সার্ভিস, পৌরসভা এবং পল্লী বিদ্যুতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সহযোগিতা করেন।
সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনজুর মোর্শেদ জানান, জেলা পরিষদের সুজালপুর মৌজায় অবস্থিত ১ একর ৪৪ শতক জমির অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পৌর শহরের তাজমহল মোড় থেকে থানা গেট পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা ও ফুটপাতের দোকান অপসারণের কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।
ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এখানে ব্যবসা করে আমরা জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। হঠাৎ দোকান সরিয়ে ফেলতে হওয়ায় আমাদের আয়-রোজগার নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, সরকারি জমি উদ্ধারের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনা করা হোক। সম্ভব হলে আমাদের বিকল্প জায়গায় ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হোক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাঠের আশপাশে এবং সড়কের দুই পাশে থাকা দোকানপাট ও স্থাপনা সরিয়ে নিতে এর আগে নোটিশ দেওয়া হয়। মাইকিংয়ের মাধ্যমেও স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা প্রচার করা হয়। নির্ধারিত সময়ের পর প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে।
ডাক্তারখানা মাঠের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বীরগঞ্জের পুরোনো প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। ১৮৯০ সালে বীরগঞ্জ থানা প্রতিষ্ঠার সময় ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন দিনাজপুর জেলা পরিষদ থানা-সংলগ্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো গড়ে তোলে। সেখানে ডিসপেনসারি, চিকিৎসকের আবাসন ও কম্পাউন্ডারের আবাসন ছিল বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মিত হলে পুরোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এরপর মাঠটির ব্যবহার, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা তৈরি হয়।
চলতি বছরের ১৮ মে দিনাজপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল এবং দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সংসদ সদস্য মো. মনজুরুল ইসলাম ডাক্তারখানা মাঠ পরিদর্শন করেন। এ সময় মাঠটির উন্নয়ন ও সংরক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক পার্ক নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে মাঠটি পৌরবাসীর অবসরযাপন, শিশুদের বিনোদন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থানটির পরিচয় সংরক্ষণ ও পরিবেশ উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রশাসনের এ উদ্যোগের পর মাঠটির জমি স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখা এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন স্থানীয়রা। জমির সীমানা চিহ্নিত করা, নিয়মিত তদারকি এবং পুনর্দখল প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাজমহল মোড় থেকে থানা গেট পর্যন্ত সড়কের ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা গেলে পথচারীদের চলাচল সহজ হবে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে পারে।
