
আজহারুল আজাদ জুয়েল – ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে দিনাজপুরের যে কজন উচ্চ শিক্ষিত বিশেষ ব্যক্তিত্ব শহিদ হয়েছেন শহিদ অ্যাডভোকেট সুমঙ্গল কুমার কুন্ডু ছিলেন তাঁদেরই একজন। তৎকালিন সময়ের একজন প্রখ্যাত আইনজীবী তিনি। বৃহত্তর দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট হতে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ডাকসাইটে আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি ছিল তাঁর। কারমাইকেল হতে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে কোলকাতায় এলএলবি পড়া তুখোর এই আইনজীবী যিনি দিনাজপুর জেলা জজকোর্টে দেওয়ানী ও ফৌজদারী সব বড় বড় মামলা পরিচালনা করতেন। তাঁর আগে মুন্সেফগীরী করেছেন।
সুমঙ্গল কুমার কুন্ডুর বাড়ি দিনাজপুর শহরের বড়বন্দরে। ১৯৭০ সালে তাঁর নিজ হাতে গড়া দ্বিতল বাড়িটি এখনো তাঁর স্মৃতি বহন করছে। সেই বাড়ির দেয়ালে আইনজীবী হিসেবে লাগানো নামফলক এখনো যেন তাঁর অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে।
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যবর্তী সময়ে পাকিস্তানি সেনারা দিনাজপুর শহর দখল করার পর হাজারো মানুষ ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। কেউ গ্রামে যায়, কেউ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যায়। কিন্তু সুমঙ্গল কুন্ডু পালিয়ে না গিয়ে নিজ বাড়িতে থেকে যান। ছয় ভাই- বোনের সবার বড় ছিলেন তিনি। ভাই-বোনদের কেউ পড়ার কারণে কেউ চাকুরির কারণে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছিল। তাঁদেরকে ছেড়ে পালিয়ে যেতে তাঁর মন সায় দেয় নাই। বিবেক বাঁধা দিচ্ছিল কারণ সংসারে তিনিই বড় সন্তান। বিবেকের তাড়ণা ও দায়িত্ববোধের কারণে ভিনদেশে তো বটেই নিজ দেশেও অন্য কোথাও চলে যেতে তাঁর মন সায় দেয় নাই। এর পরিণতি হয়েছিল ভয়াবহ। ২৩ এপ্রিল বড়বন্দরের বাড়ি থেকে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর গুলি করে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বলে জানা যায়। তাঁর লাশ পাওয়া যায় নাই। মৃত্যুকালে বয়স ছিল ৫৫-৫৬ বছরের মত।
শহিদের সন্তান অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা সরোজ কুমার মন্ডলের কাছ থেকে জানা যায় যে, সুমঙ্গল কুন্ডর ভাই-বোনেরা তখন যথেষ্ট ছোট। তাদের কেউ চট্টগ্রামে, কেউ ময়মনসিং, কেউ নীলফামারিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কারনে অবস্থান করছিল। তিনি ছিলেন সবার গার্জিয়ান। তাই তাঁদেরকে ইন্ডিয়ায় যেতে চান নাই। তাঁকে অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিল ইন্ডিয়ায় যাওয়ার। কিন্তু তিনি মনে করেছিলেন যে, তাঁর যাওয়াটা অন্য ভাই-বোনদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। আগে সবাই যাক, তারপর তিনিও যাবেন, এমন একটা ভাবনা তাঁর মধ্যে ছিল। পরিণতিতে তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।
শহিদের উত্তরসরিদের কাছ থেকে আরো জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা দিনাজপুর শহরে ঢোকার পর তাঁকে দুই-তিন বার ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দিয়েছিল এবং বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ ৯ বৈশাখ ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আর ছাড়ে নাই। লোকজনের কাছ থেকে পরিবারের সদস্যরা জেনেছেন যে, সেদিনেই রেলবাজার গরুহাটির কাছে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
সুমঙ্গল কুন্ডুর নাতি বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ফার্ম্মেসী বিভাগের শিক্ষক সুকল্যাণ কুমার কুন্ডু রাজু, পিতা- সলিল কুমার কুন্ডু জানান, তার দাদু শহিদ সুমঙ্গল কুন্ডুকে পাকিস্তানি সেনারা পরপর দুইবার ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছিল। তৃতীয় বার ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ছাড়ে নাই। তাঁকে ঠিক কোন তারিখে হত্যা করা হয়েছে, তা সঠিকভাবে জানা যায় নাই। তবে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তাঁকে বাংলা ৯ বৈশাখে হত্যা করা হয়েছে, দিনটি ছিল মঙ্গলবার। ১৯৭১ সালের ৯ বৈশাখ ছিল ইংরেজী ২৩ এপ্রিল। সেই হিসেবে ২৩ এপ্রিল তারিখে পারিবারিকভাবে দাদুর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়।
ব্যবসায়ী জতিন্দ্র মোহন কুন্ডু ও কুসুম রানী কুন্ডুর সন্তান ছিলেন। তাদের অন্য সন্তানরা হলেন সত্যন্দ্রনাথ কুন্ডু (বর্তমানে ভারতের হলদীবাড়িতে থাকেন), রামচন্দ্র কুন্ডু (ভারতের নদীয়ায় বসবাস), শিবাপদ কুন্ডু (নীলফামারীতে থাকেন) ও অমল কুমার কুন্ডু (চট্টগ্রামে ব্যবসা করেন)।
সুমঙ্গল কুন্ডুর দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর সিলেটের তুলশী রানী কুন্ডুর সাথে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি এখনো বেঁচে আছেন এবং নীলফামারীতে বসবাস করছেন। সুমঙ্গল কুন্ডুর সন্তান সংখ্যা ১০। ৫ ছেলে, ৫ মেয়ে। ছেলেদের নাম মৃত অ্যাডভোকেট সলিল কুমার কুন্ডু, ডা. সরিৎ কুমার কুন্ডু (বর্তমানে ভারত প্রবাসী), সরোজ কুমার কুন্ডু (উত্তরা ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত জিএম), মৃত সুহাস কুসুম কুন্ডু (নীলফামারীর মশিউর রহমান ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক ছিলেন) ও অ্যাডভোকেট বিপ্লব কুন্ডু (নীলফামারীতে আইন পেশায় যুক্ত)। মেয়েদের নাম মিনা রানী কুন্ডু, সন্ধ্যা রানী কুন্ডু, ছবি রানী কুন্ডু, মধুমিতা কুন্ডু ও সুস্মিতা কুন্ডু। সন্তানদের মধ্যে সলিল কুন্ডু ও মিনা রানী কুন্ডু প্রথম স্ত্রীর। অন্যেরা দ্বিতীয় স্ত্রীর। মুক্তিযুদ্ধের সময় ইন্ডিয়ায় অবস্থানকালে মিনা ও সন্ধ্যার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল এবং তাঁরা ইন্ডিয়াতেই বসবাস করছেন। অবশ্য এরই মধ্যে দুই বোনের একজন মিনা রানী কুন্ডু মারা গেছেন বলে জানা গেছে।
দিনাজপুর শহরের বড় বন্দরে অ্যাডভোকেট সুমঙ্গল কুন্ডুর দ্বিতল যে বাড়িটি রয়েছে সেই বাড়ি ১৯৭০ সালে নির্মাণ করেছিলেন। নির্মাণের এক বছরের মধ্যে এই বাড়ি থেকে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাড়িটিতে শহিদের বড় সন্তান সলিল কুমার কুন্ডু থাকতেন। তিনি কয়েক বছর হলো মারা গেছেন। বর্তমানে সলিল কুন্ডুর পুত্র সুকল্যাণ কুমার কুন্ডু রাজু বাড়িটিতে থাকেন।
আজহারুল আজাদ জুয়েল – লেখক সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক